ঘূর্ণিঝড় এবং সর্তকতা

Sudip Bera, May 16, 2020

বর্তমানে আমরা সবাই ঘূর্ণিঝড় আম্ফানকে নিয়ে আতঙ্কে আছি। কারন এখনো আমাদের ১৯৯৯ এ ঘটে যাওয়া ওড়িশা সাইক্লোন, ২০১৩ সালের ফাইলিন বা ২০১৯ এ ঘটে যাওয়া ফানি বা বুলবুল এর ধংসলীলা ভোলার নয়। আন্দামান সাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপ আম্ফান দফায় দফায় তার শক্তি বাড়িয়ে তা ক্রমেই ঘূর্ণিঝড়ের আকার ধারণ করছে।গত বছর রেকর্ড সংখ্যক আটটি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছিল ৷ এ বছর এ*খনও পর্যন্ত কোনও ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হতে না হলেও এবার তার  সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে ৷ এই ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেওয়া হয়েছে আমফান।
ঘূর্ণিঝড় বলতে বোঝায় যে যখন সমুদ্রের উপর কোনো নিম্নচাপ বা low pressure তৈরি হয়।ঘূর্ণিঝড় হল ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচন্ড ঘূর্ণি বাতাস সম্বলিত আবহাওয়ার একটি নিম্ন-চাপ প্রক্রিয়া যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এই ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। এই ঘূর্ণিঝড়ের সময় সরকার দ্বারা ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু সতর্কতা জারি করা হয় সাধারন মানুষের জন্য।
ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা (Cyclone warning)
চারটি পর্যায়ে রাজ্য সরকার দ্বারা ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি করা হয়। সাধারণ আবহাওয়াতে দিনে চারবার এবং যখন ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থা তৈরি হয় তখন আবহাওয়ার ক্ষেত্রে এই চার পর্যায়ের মাধমে সতর্কতা মেনে প্রতি তিন ঘন্টা অন্তর বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। এবং আমরা দেখি যে ঘূর্ণিঝড়ের সময় বিভিন্ন রকম  Colour warning  দেওয়া হয়। যেমন কখনও বলা হয় সমুদ্রে Red alart আবার কখনও বলা হয় যে yellow alart জারি করা হয়েছে। তাই কখন কোন অবস্থা জারি করা হয় সেগুলো জেনে নেব এবং ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে সচেতন হবো। আর সচেতন হলে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হবে। বর্তমানে আমাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস খুবই উন্নত। তাই কোন সময় কি ঘটবে তা আমরা খুব সহজেই জানতে পারি অনেক আগেই আর সেই মতো সচেতনও হতে পারি আমরা।
প্রথম পর্যায়: Status of Pre- Cyclone watch
প্রথম পর্যায়ের সতর্কতাকে বলা হয় "PRE-CYCLONE WATCH" । এটি উত্তর ভারত মহাসাগরে একটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের পরিণত হওয়ার ৭২ ঘণ্টা মধ্যে জানানো হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়: Status of Yellow  weather alart- Be Alart
দ্বিতীয় পর্যায়টি সতর্কতাটি  "সাইক্লোন এলার্ট (CYCLONE ALART) নামে পরিচিত। অর্থাৎ এই পযার্য়ে জনগন কে ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে সচেতন বা Alart করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের সতর্কতাটি কমপক্ষে 48 ঘন্টা জারি করা হয়। উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রত্যাশিত শুরু হওয়ার আগেই। এতে ঝড়ের অবস্থান এবং তীব্রতার দিকনির্দেশ, তীব্রতা, উপকূলীয় জেলাগুলি প্রতিকূল আবহাওয়া এবং জেলেদের, সাধারণ জনগণ, মিডিয়া এবং দুর্যোগ পরিচালকদের সতর্ক করা হই।
তৃতীয় পর্যায়: Status of Orange weather alart- Be Prepared
তৃতীয় পর্যায়ের সতর্কতাটি "সাইক্লোন সতর্কতা" (CYCLONE WARNING) নামে পরিচিত ।এই পর্যায়ে জনগনকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা করার জন্য তৈরি হতে বলা হয়। তৃতীয় পর্যায়ের সতর্কতয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রত্যাশিত শুরু হওয়ার কমপক্ষে 24 ঘন্টা আগে জারি করা হয়। এই পর্যায়ে স্থলপথের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। এই সতর্কতাগুলি এসিডব্লিউসি / সিডাব্লুসি / এবং সিডাব্লুডি দ্বারা তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ঘূর্ণিঝড়ের সর্বশেষ অবস্থান এবং তার তীব্রতা, সম্ভাব্য আঘাত পয়েন্ট এবং সময়, জড়িত ভারী বৃষ্টিপাত, তীব্র বাতাস এবং ঝড়ের তীব্রতা ও তাদের প্রভাব জানানো হয়।
চতুর্থ পর্যায়: Status of Red weather alart- Take action
চতুর্থ পর্যায়ের সতর্কতাটি "পোষ্ট ল্যান্ডফাল আউটলুক"(POST LANDFILL OUTLOOK) নামে পরিচিত। এই পর্যায়টি ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হওয়ার পরবর্তী পর্য়ায়।  চতুর্থ পর্যায়ের সতর্কতাটি সংশ্লিষ্ট এসিডাব্লুসিসি / সিডাব্লুসি / এবং সিডাব্লুডির দ্বারা সদর দফতরে প্রত্যাশিত সময়ের কমপক্ষে 12 ঘন্টা আগে জারি করা হয়। এটি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের পরে এবং অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে বিরূপ আবহাওয়ার অভিজ্ঞতার পরে ঘূর্ণিঝড়ের চলাচলের দিকনির্দেশ দেয়।
ঘূর্ণিঝড় এর সময় কি করা উচিত আর কি করা অনুচিত
সাধারণ জনগণ, উপকূলীয় বাসিন্দারা এবং জেলেদের রাজ্য সরকারের মাধ্যমে সতর্ক করা হয় এবং অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং জাতীয় টেলিভিশন (দূরদর্শন) এর মাধ্যমে সতর্কতা প্রচার করা হয়। এগুলি হল
ঘূর্ণিঝড় এর সময় কী করা উচিত
১) ঘরগুলি পরীক্ষা করুন, যেখানে প্রয়োজন সেখানে সিমেন্টিং করে টাইলগুলি সুরক্ষিত করুন, দরজা এবং জানালা মেরামত করুন।
২) বাড়ির আশেপাশের অঞ্চলটি পরীক্ষা করুন। মরা গাছ, আলগা ইট, আবর্জনার ক্যান, সাইন-বোর্ড, ইত্যাদি সরান।
৩) কিছু কাঠের বোর্ড প্রস্তুত রাখুন যাতে কাচের জানালাগুলি বসতে পারে। ক্যারোসিন, ফ্ল্যাশ লাইট এবং একটি হারিকেন ল্যান্টন রাখুন।
৪) তাত্ক্ষণিকভাবে condemned ভবনগুলি ধ্বংস করা।
৫) যাদের রেডিও সেট রয়েছে তাদের উচিত রেডিওগুলি পুরোপুরি সেবার যোগ্য কিনা তা নিশ্চিত করা। ট্রানজিস্টরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সেট ব্যাটারি হাতে রাখতে হবে।
৬) আপনার রেডিও চালু রাখুন এবং নিকটস্থ এআইআর ( )স্টেশন থেকে সর্বশেষ আবহাওয়ার সতর্কতা এবং পরামর্শগুলি শুনুন। তথ্য অন্যের কাছে পৌঁছে দিন।
৭) আপনি রেডিও থেকে প্রাপ্ত সরকারী তথ্য অন্যদের কাছে দিন।
৮) নীচু সমুদ্র সৈকত বা অন্যান্য স্থানগুলি থেকে দূরে সরে যান যা উচ্চ জোয়ার বা ঝড়ের তরঙ্গ দ্বারা বয়ে যেতে পারে।
৯) আপনার ঘরটি যদি উচ্চ জোয়ার এবং নদী থেকে বন্যার ঝুঁকির বাইরে থাকে এবং এটি ভালভাবে নির্মিত হয় তবে এটি সম্ভবত সবচেয়ে ভাল জায়গা। তবে, সরিয়ে নেওয়ার কথা বললে দয়া করে অবিলম্বে কাজ করুন।
১০) ভারী বৃষ্টির কারণে নদীর স্রোত বয়ে যেতে পারে এমন অঞ্চলে উচ্চ জলের জন্য সতর্ক থাকুন।
১১) অতিরিক্ত খাবার পান, বিশেষত যে জিনিসগুলি রান্না না করে বা খুব অল্প প্রস্তুতির সাথে খাওয়া যায়। যথাযথভাবে পাত্রটিতে অতিরিক্ত পানীয় জল সঞ্চয় করুন।
১২) নিশ্চিত হয়ে নিন যে বাড়ির পাশের দিকে একটি দরজা খোলা যেতে পারে
১৩) শিশুদের এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিশেষ ডায়েটের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিধান করুন।
১৪) যদি ঝড়ের '' চোখ '' কেন্দ্রটি সরাসরি আপনার জায়গার উপর দিয়ে যায় তবে বাতাস এবং বৃষ্টিপাতের প্রবণতা দেখা দেবে, আধা ঘন্টা বা তারও বেশি সময় চলবে। এই সময়কালে নিরাপদ স্থানে থাকুন।
১৫) গাড়ি, বাস, লরি এবং কার্টগুলি সাবধানতার সাথে চালিত করা উচিত।
১৬) স্বজনদের অবিলম্বে দুর্যোগ অঞ্চলের সুরক্ষা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
ঘূর্ণিঝড় এর সময় কী করা উচিত না
১) গুজবে বিভ্রান্ত হওয়া এড়িয়ে চলুন।
২) উদ্ধারকর্মীদের দ্বারা অবহিত না হওয়া পর্যন্ত আশ্রয়স্থান ছেড়ে যাবেন না।
৩) ল্যাম্প পোস্ট থেকে আলগা এবং ঝুলন্ত তারের স্পর্শ করবেন না, এতে বৈদ্যুতিক স্রোত থাকতে পারে।
বায়ুর গতিবেগ অনুয়ায়ি ঘূর্ণিঝড়ের শ্রেণীবিভাগ
অর্থাৎ বায়ুর গতিবেগের উপর ভিত্তি করে ঘূর্ণিঝড় এর শ্রেণীবিভাগ করা হয়। ডিপ্রেসন (17–27 kt to31–50 km/h) থেকে শুরু করে একদম সুপার সাইক্লোন (≥120 kt to ≥221 km/h) পর্যন্ত। অথাৎ বায়ুর গতিবেগ প্রতিঘন্টায় ২২০  কিমির বেশি হলেই আমরা তাকে সুপার সাইক্লোন বলি।নিচে পূনাঙ্গ দেওয়া হল
Category
Sustained winds (3-min average)
Super Cyclonic Storm
≥120 kt to ≥221 km/h
Extremely Severe Cyclonic Storm
90–119 kt to 166–220 km/h
Very Severe Cyclonic Storm
64–89 kt to 118–165 km/h
Severe Cyclonic Storm
48–63 kt to 89–117 km/h
Cyclonic Storm
34–47 kt to 63–88 km/h
Deep Depression
28–33 kt to 51–62 km/h
Depression
17–27 kt to31–50 km/h
এছাড়াও আরও একটা বিষয় আমরা দেখি যে বছরের বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়। মূলত সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রার (এসএসটি) কারণে পশ্চিম আরব সাগরের ওপরে ঘূর্ণিঝড়ের ফ্রিকোয়েন্সি খুব কম বঙ্গোপোসাগরে)।ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৬-২৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস থাকা আবশ্যক। ঘূর্ণিঝড়ের নিম্নচাপের ক্ষেত্রে এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ সম্ভাবনা থাকে তারপরে মার্চ, মে এবং নভেম্বর এবং তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের নিম্নচাপের ক্ষেত্রে এপ্রিল এবং নভেম্বর পরে তার সম্ভাবনা থাকে।বঙ্গোপোসাগরের উপকূলে মূলতঃ বর্ষাকালের শুরুতে এপ্রিল-মে মাসে এবং বর্ষার শেষে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বেশি দেখা দেয়। তবে বর্ষাকালেও বিক্ষিপ্তভাবে ঘূর্ণিঝড় হতে দেখা যায়

আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র (আরএসএমসি/RSMC), নয়াদিল্লি, মোট ঘূর্ণিঝড়ের ফ্রিকোয়েন্সি ভিত্তিতে ভারতের জেলাগুলির বিপদ সর্বজনীনতা  ঘূর্ণিঝড়, প্রকৃত / আনুমানিক সর্বাধিক বায়ু শক্তি, সম্ভাব্য সর্বাধিক ঝড় বৃদ্ধি প্রভ্রতি বিষয় এর উপর ভিত্তি করে ভারতের মোট ৯৬ টী জেলাকে চিহিত করেছে। তার মধ্যে উপকূল স্পর্শ করে আছে ৭২ টি জেলা এবং উপকূল স্পর্শ না করে আছে ২৪ টি জেলা।  ৯৬ টি জেলার মধ্যে ১২ টি অত্যন্ত প্রবণ, ৪১ টি অধিক প্রবণ, ৩০টি রয়েছে মাঝারিভাবে প্রবণ, এবং বাকি ১৩ টি জেলা কম প্রবণ।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ
Knots: Nautical miles per hour. 1 Knots = 1.86 KM per hour
Low- or low-pressure area: An area enclosed by a closed isobar with minimum pressure inside when mean surface wind is less than 17 knots (31 kmph).
Post Landfall Outlook: This bulletin is issued 12 hours before cyclone landfall and contains more specific forecasts about place and time of landfall.
তথ্যঃ আবহাওয়া কেন্দ্র, ভারত


Comments